অধ্যাপক ডা. এস এম সফিউল আজম চৌধুরী
এফসিপিএস (সার্জারী) · বিভাগীয় প্রধান, সার্জারী বিভাগ — কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ · জেনারেল ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন
‘অপারেশন’ শব্দটাই ভয় ধরিয়ে দেয়। কিন্তু সিদ্ধান্তটা ভয় থেকে নয় — পরিষ্কার তথ্য থেকে নেওয়ার কথা।
আপনার সমস্যাটা কি এগুলোর একটা?
যেটা আপনার সাথে মিলে যায়, সেটায় চাপ দিন — কোন ধরনের সার্জারির আওতায় পড়ে, দেখে নিন।
যেসব সমস্যায় পরামর্শ ও সার্জারি
প্রতিটা ক্ষেত্রেই প্রথম ধাপ পরীক্ষা ও পরামর্শ — অপারেশন লাগবে কি না, সেটাই আগে ঠিক হয়।
ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি
বড় করে না কেটে, ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও যন্ত্র ঢুকিয়ে করা অপারেশন। কোন রোগীর ক্ষেত্রে এটি সম্ভব, তা পরীক্ষা করে ঠিক করা হয়।
- পিত্তথলির পাথরের অপারেশন
- অ্যাপেনডিক্সের অপারেশন
- হার্নিয়ার অপারেশন
- পেটের ভেতরের রোগ নির্ণয়ে ক্যামেরা
- কোন পদ্ধতি আপনার জন্য — পরামর্শ
পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালী
আল্ট্রাসনোতে পাথর ধরা পড়লেই সবার অপারেশন লাগে না — কার লাগে আর কার লাগে না, সেটা পরীক্ষা ও উপসর্গ দেখে ঠিক হয়।
- পেটের ডান দিকে উপরে ব্যথা
- চর্বি বা ভারী খাবারের পর ব্যথা
- বমি বমি ভাব, পেট ফাঁপা
- চোখ-শরীর হলুদ হয়ে যাওয়া
- আল্ট্রাসনোতে পাথর ধরা পড়েছে
হার্নিয়া
কুঁচকি, নাভি বা আগের অপারেশনের দাগের জায়গায় ফোলা। কাশি বা ভারী কাজে বেড়ে যায়, শুয়ে পড়লে কমে — এই ধরনটাই সবচেয়ে পরিচিত।
- কুঁচকিতে বা নাভির কাছে ফোলা
- কাশি বা ভারী তুললে ফোলা বাড়ে
- দাঁড়ালে বাড়ে, শুলে কমে
- আগের অপারেশনের দাগে ফোলা
- ফোলা জায়গায় টান ধরা ব্যথা
- হাইড্রোসিল / একশিরা — অণ্ডকোষে পানি জমা
পাইলস, ফিস্টুলা ও ফিসার
যে সমস্যাগুলো লজ্জায় চেপে রাখা হয় বলে দেরি হয়। প্রতিটার চিকিৎসা আলাদা — সবগুলোতেই অপারেশন লাগে না।
- পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া
- পায়খানার সময় বা পরে জ্বালাপোড়া
- পায়খানার রাস্তায় ব্যথা, বসতে কষ্ট
- পায়খানার রাস্তার পাশে ফোলা বা রস পড়া
- কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি
শরীরের চাকা, গোটা ও থাইরয়েড
গলার ফোলা, স্তনের চাকা, চামড়ার নিচের গোটা — কোনটা ক্ষতিকর নয় আর কোনটা পরীক্ষা করে দেখা দরকার, সেটাই প্রথমে জানা জরুরি।
- গলার সামনে ফোলা (থাইরয়েড)
- স্তনে চাকা বা শক্ত গোটা
- চামড়ার নিচে গোটা বা সিস্ট
- বগলে বা গলায় গিলটি
- স্তনে ফোঁড়া বা এবসেস
- পুরনো গোটা হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া
পেট, কোলন ও খাদ্যনালীর সার্জারি
পায়খানার অভ্যাসের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন, ওজন কমে যাওয়া বা পেটের ভেতরের চাকা — এ ধরনের উপসর্গ দেরি না করে দেখানোর কথা।
- পায়খানার অভ্যাস হঠাৎ বদলে যাওয়া
- দীর্ঘদিন ধরে পেটে ব্যথা
- কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া
- পেটে চাকা অনুভব করা
- কোলন ও রেকটাল ক্যান্সারের সার্জারি
- পাকস্থলী ও অন্ত্রের অপারেশনে পরামর্শ
ডায়াবেটিক ফুট ও পায়ের ঘা
ডায়াবেটিসে পায়ের ঘা সহজে শুকাতে চায় না, আর দেরি হলে জটিলতা বাড়তে পারে। বার্জারস ডিজিজসহ পায়ের রক্তনালীর সমস্যাতেও সার্জিকাল পরামর্শ।
- পায়ে ঘা, শুকাতে চায় না
- ডায়াবেটিসে পায়ের ক্ষত
- পায়ের আঙুল কালচে হয়ে যাওয়া
- হাঁটলে পায়ে ব্যথা বা ঝিমঝিম
- পায়ের ক্ষতে দুর্গন্ধ
- বার্জারস ডিজিজে পরামর্শ
জরুরি ও ট্রমা সার্জারি
হঠাৎ তীব্র পেট ব্যথা, দুর্ঘটনার আঘাত, ফোড়া বা সংক্রমণ — যেসব ক্ষেত্রে অপেক্ষা না করে সরাসরি হাসপাতালে যেতে হয়।
- হঠাৎ তীব্র পেট ব্যথা
- একটানা বমি, পেট শক্ত হয়ে যাওয়া
- দুর্ঘটনায় পেটে বা শরীরে আঘাত
- ফোড়া, পুঁজ বা ক্ষত
- পুড়ে যাওয়া বা কাটা ক্ষতের সেলাই
ভয়টা অপারেশনের নয় — ভয়টা না জানার।
কোথায়, কখন, কীভাবে পৌঁছাবেন
কুমিল্লা ট্রমা সেন্টার (CTC)
স্পেশালাইজড অর্থোপেডিক ও জেনারেল হাসপাতাল
| দিন | রোগী দেখার সময় |
|---|---|
| প্রতিদিনশনি – বৃহস্পতি | বিকাল ৫টা – সন্ধ্যা ৭টা |
| শুক্রবার | চেম্বার বন্ধ |
সিরিয়ালের হেল্পলাইন
চেম্বারের সময়ের আগে কল করে সিরিয়াল নিয়ে নিলে অপেক্ষা কম।
WhatsApp-এ সিরিয়ালচেম্বারে আসার আগেই প্রশ্নের উত্তর
সার্জারি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সবাই করেন — উত্তরগুলো ডাক্তারের নিজের মুখেই।
এক জীবনের গল্প
One life. One living album.
যিনি আপনার অপারেশনের সিদ্ধান্ত দেবেন, চেম্বারে ঢোকার আগে তাঁকে একটু চিনে নিন — তাঁর নিজের কথায়, তাঁর নিজের পথের গল্প।
সতেরোবার ফেল, তবু থামেননি যিনি
পুরো ফিচার পড়ুনসতেরোবার ফেল, তবু থামেননি যিনি
ফুটো স্যান্ডেল, ধারের জুতা, অভাব আর একের পর এক বদলি পেরিয়ে আজ তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান। অধ্যাপক ডা. এস এম সফিউল আজম চৌধুরীর গল্প।
ঢাকার পিজি হাসপাতালের পাশে বড় মসজিদটার কাছে একটা পিলার। নব্বইয়ের দশকের শেষে তার গোড়ায় বসতেন এক মুচি। এক তরুণ চিকিৎসক প্রায়ই তাঁর কাছে আসতেন একজোড়া চামড়ার স্যান্ডেল নিয়ে। স্যান্ডেলের তলা ক্ষয়ে ফুটো হয়ে গেছে, বৃষ্টির দিনে নিচ দিয়ে পানি ওঠে। মুচি সেলাই করে দিতেন, পারিশ্রমিক কখনো দুই টাকা, কখনো পাঁচ।
১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে সেই তরুণ এফসিপিএস প্রথম পর্বের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। এবার ভাইভা। কিন্তু ভাইভা বোর্ডের সামনে তো সেলাই করা স্যান্ডেল পরে যাওয়া যায় না।
"লিখিত পরীক্ষা তো দিয়ে এসেছি, কেউ দেখেনি স্যান্ডেলের নিচ দিয়ে পানি ওঠে," হেসে বললেন তিনি। "কিন্তু ভাইভায় কী পরে যাব? একটা শার্ট নেই, একটা প্যান্ট নেই।"
এক বড় ভাই হাতে দিলেন দেড় হাজার টাকা, ধার হিসেবে। সে সময় ক্লিনিকে সারা মাস চাকরি করে তাঁর বেতন ছিল তিন হাজার টাকা। এলিফ্যান্ট রোডের বাটার মোড় থেকে কেনা হলো একজোড়া অক্সফোর্ড জুতা, দাম সাড়ে পাঁচশ টাকার মতো। একটু এগিয়ে ছাড়ের দোকান থেকে একটা সাদা শার্ট।
নতুন জুতা আর সাদা শার্ট পরে তিনি ভাইভা দিলেন, এবং অকৃতকার্য হলেন।
সেই তরুণ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এস এম সফিউল আজম চৌধুরী। আজ তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান।
গিলাতলীর নানাবাড়ি থেকে
কুমিল্লার বিবির বাজার সীমান্তের পাশে গিলাতলী গ্রামের কাজীবাড়ি, তাঁর নানার বাড়ি। সেখানেই জন্ম, সেখানেই দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়া। তারপর কুমিল্লা শহরে ঠাকুরপাড়ার রামকৃষ্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীরদাসুন্দরী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আর তারপর কুমিল্লা জিলা স্কুল। ১৯৮৫ সালে জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে উচ্চমাধ্যমিকের জন্য চলে যান ঢাকার নটর ডেম কলেজে।
চার দশক পরেও কলেজের রোল নম্বরটা তিনি না থেমে বলে দেন: "আট-সাত-দুই-নয়-শূন্য।" তারপর ব্যাখ্যাও দেন, "সাতাশি সালের পরীক্ষার্থী, গ্রুপ টু, রোল নব্বই।"
সে সময় তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। "আমার জীবনের আশা ছিল, ইচ্ছা ছিল, সবকিছুই ছিল আমি ইঞ্জিনিয়ার হব," বললেন তিনি। "আমার ডাক্তার হওয়ার কথা ছিল না।"
কিন্তু নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর জীবনে একটা বড় শোক আসে। ক্যান্সারে মারা যান মা। "মা মারা যাওয়ার পর বাবা হয়তো মাথায় নিয়েছিলেন, ছেলেকে ডাক্তার বানাবেন," বললেন তিনি।
উচ্চমাধ্যমিকের পর ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পেলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় এল ১৩৭ নম্বরে তাঁর নাম, বুয়েটে অপেক্ষমাণ তালিকায়। বাবা জানিয়ে দিলেন, ওদিকে যাওয়ার দরকার নেই। ছেলে মেডিকেলে ভর্তি হলেন।
"প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের পর সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত পড়তাম। সারা বছর। এখনো এটা মেনে চলি।"
মেডিকেল কলেজে নিজের জন্য একটাই নিয়ম বানিয়েছিলেন: প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিন ঘণ্টা পড়া, একদিনও বাদ না দিয়ে। ১৯৯৫ সালে এমবিবিএস পাস করেন।
"চিকন ছেলেটা সারা দিন ওয়ার্ডে পড়ে থাকে"
সার্জারিতে আসাটা অনেকটা এক বন্ধুর এক কথায়। চূড়ান্ত পরীক্ষার সার্জারি অংশ খুব ভালো হয়েছিল। হল থেকে বেরোনোর পর বন্ধু আব্দুল্লাহ আল তারেক বললেন, "তুই এত ভালো পরীক্ষা দিয়েছিস, সার্জারিতে ক্যারিয়ার কর।"
ইন্টার্নশিপে সার্জারি ইউনিটে রোগী দেখা আর অস্ত্রোপচারের হাতেখড়ি হয় তাঁর। এ জন্য তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে নাম নেন দুজনের: ডা. শাহাদাত হোসেন শেখ, পরে যিনি কলোরেক্টাল সার্জারির অধ্যাপক হন, আর অধ্যাপক এ বি এম জামাল, পরে যিনি বিসিপিএসের সেক্রেটারি হন।
সকাল আটটায় ওয়ার্ডে ঢুকতেন, দুপুরে খেয়ে একটু ঘুমিয়ে আবার ফিরতেন। বাইরে কোনো ক্লিনিকে কাজ করতেন না। তাঁর হাসিমুখে বলা সেই সময়ের কথা: "অনেকে বলত, এই চিকন ছেলেটা সারা দিন ওয়ার্ডে পড়ে থাকে।"
এক বেতন, দুই বন্ধু
তিনি যখন মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষে, বাবা অবসরে যান। সামান্য পেনশন দিয়ে সংসার চলে, আরও দুই ভাই আছেন। ইন্টার্নশিপ শেষ হতেই তাই নিজের খরচ নিজেকেই জোগাতে হলো।
১৯৯৬ সালে মগবাজারের একটি পুরোনো ক্লিনিকে মেডিকেল অফিসারের চাকরি নিলেন। এক বেলা ডিউটি, আরেক বেলা পিজির লাইব্রেরিতে পড়া। থাকতেন পিজির পেছনে নবাব হাবিবুল্লাহ রোডের একটি মেসে, এক ঘরে দুই-তিনজন। পরে নারায়ণগঞ্জের একটি ক্লিনিকে নিলেন টানা ২৪ ঘণ্টার ডিউটি, রাত দশটায় ঢুকে পরদিন রাত দশটায় বেরোনো। কিছুদিন সপ্তাহে তিন দিন দুপুরে এক ঘণ্টা করে একটি গার্মেন্টসে রোগী দেখেছেন। তিন মাসে জমেছিল ছয় হাজার টাকা, তা দিয়েই বিসিপিএসের কোর্স।
"দিন শেষে তো ভাত খেতে হয়," বললেন তিনি। "টাকা জোগাড় করতে হবে, থাকার জায়গা লাগবে, তারপর পড়ালেখা। পড়ালেখা তখন দ্বিতীয়।"
এই কঠিন সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ স্মৃতিটা বন্ধুত্বের। একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন বন্ধু মঞ্জুরুল রহিম জুয়েল। এমএসে সুযোগ পাওয়ার কিছুদিন পর তিনি জানালেন, তাঁর সঞ্চয় শেষ। দুই বন্ধু তখন সপ্তাহের দুটি ডিউটি ভাগ করে নিলেন, একজন একটা, আরেকজন আরেকটা। বেতন আসত একজনের নামে। "যে বেতনটা তুলে আনত, আমরা দুজন ভাগ করে নিতাম," বললেন তিনি। পরীক্ষার সময় একজন আরেকজনের ডিউটি করে দিতেন। সেই বন্ধু আজ ইএনটির অধ্যাপক।
সতেরোটি দরজা
সাদা শার্ট আর নতুন জুতায় দেওয়া সেই ভাইভা দিয়ে শুরু, তারপর একের পর এক দরজা বন্ধ হতে থাকে। ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে এফসিপিএস প্রথম পর্ব, এমএস প্রথম পর্ব, পঙ্গু হাসপাতালের ভর্তি পরীক্ষা, সবগুলোতেই অকৃতকার্য। তাঁর নিজের হিসাব রাখা আছে: এফসিপিএসের দুই পর্ব, এমএসের তিন পর্ব আর ভর্তি পরীক্ষা মিলিয়ে সব মিলিয়ে সতেরোটি পরীক্ষায় তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন।
"মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু জেদ ধরে ছিলাম।"
২০০০ সালের জানুয়ারিতে আবার এফসিপিএস প্রথম পর্ব। তখনকার ভাইভা ছিল নব্বই মিনিটের, একটানা পাঁচটি বোর্ড। "এই নব্বই মিনিট যে নিজের চাপটা ধরে রাখতে পারবে, সে পাস করবে," বললেন তিনি।
পরীক্ষা দিয়ে হোস্টেলে ফিরে ডাইনিংয়ে ভাত খাচ্ছিলেন, তখন একজন এসে বলল, পাস করেছেন। "এফসিপিএস পার্ট ওয়ান পাস করেছে যে ছেলেটা, তার পকেটে তখন ২০০ টাকা," হাসতে হাসতে বললেন তিনি। মাস শেষ হতে তখনো পনেরো দিন বাকি। রাতের খাবার ছিল পিজির কাছে পূবালী ব্যাংকের নিচের দোকানের ডিম-পরোটা, দুটো পরোটা আর দুটো ডিম একসঙ্গে মুড়িয়ে বানানো রোল, হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া।
কয়েক দিন পর এক পরিচিতজন এলেন একটা ফটোকপি করা কাগজ হাতে। যে লেকচারার পদের জন্য তিনি আবেদন করে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন, সেই চাকরিটা হয়ে গেছে। খবরটা প্রথমে বিশ্বাসই করেননি। সেই বছরই বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে।
বৃহস্পতিবারের বাস
বিসিএসের পর প্রথম কর্মস্থল কুমিল্লার বরুড়ার একটি স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র। এরপর সিলেট মেডিকেল কলেজ, তারপর ২০০১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে প্রশিক্ষণ। ২০০৪ সালে ঢাকায় ফিরে পোস্টগ্র্যাজুয়েট কোর্স। ২০০৫ সালের জানুয়ারি থেকে পরপর তিনবার অকৃতকার্য হওয়ার পর ২০০৬ সালের জুলাইয়ে, চতুর্থ চেষ্টায়, এফসিপিএস দ্বিতীয় পর্বে উত্তীর্ণ হন। এরপর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে রেজিস্ট্রার।
২০০৬ সালের নভেম্বরে মারা যান তাঁর বাবা। এরপর প্রায় নয় মাস প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে কুমিল্লায় এসেছেন, সংসারের বাজার করে সব গুছিয়ে শুক্রবার বিকেলে আবার ঢাকার বাস ধরেছেন। কখনো শনিবার ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই রওনা দিয়েছেন, সকালে মিটফোর্ডে হাজিরা।
"খুব কষ্টকর ছিল," বললেন তিনি। "শরীর আর কুলাচ্ছিল না।"
২০০৭ সালে ফিরে এলেন নিজের শহরে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, আবাসিক সার্জন (আরএস) হিসেবে।
দীর্ঘ পথ
এরপরের সতেরো বছর তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ, চাঁদপুর, একের পর এক বদলি। কখনো এমন পদে পদায়ন হয়েছে, যেখানে আগে থেকেই আরেকজন কর্মরত। কখনো মাসের পর মাস পদায়নহীন, বেতনহীন। সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে চাঁদপুরের যে কলেজে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে তাঁর বসার মতো একটা কক্ষও ছিল না।
সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার দুটো কথায় ফিরে আসেন।
"আমি কখনো নীতি বিক্রি করিনি। রোগীর ব্যাপারে কোনো আপস করিনি।"
ঘরে ফেরা
২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে যোগ দেন। এতে পাশে ছিলেন কুমিল্লা জিলা স্কুল আর সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ছোটবেলার বন্ধু, আর পুরোনো কয়েকজন বড় ভাই। বর্তমানে তিনি সেখানে সার্জারি বিভাগের প্রধান। জেনারেল ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন হিসেবে কুমিল্লায় রোগীও দেখেন।
বহু বছর আগে জুনিয়র কনসালট্যান্ট হয়ে প্রথম যখন এই কলেজে গিয়েছিলেন, তখনই মনে মনে ঠিক করেছিলেন, "এখানে এসে কিছু কাজ করব, কিছু শিখব, আর ছাত্রদের শেখাব।" এবার সেই ইচ্ছে পূরণের সুযোগ এল।
যে শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনার শুরু, সেই শহরেই আজ তিনি পরের প্রজন্মের সার্জনদের হাতেখড়ি দেন।
ফুটো স্যান্ডেল থেকে বিভাগীয় প্রধান। মাঝের পথে ছিল অভাব, বারবার ফেল আর দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। সেই পথ তিনি পেরিয়েছেন একটা জিনিস দিয়ে, যার নাম তিনি নিজেই দিয়েছেন: জেদ।
এক নজরে · অধ্যাপক ডা. এস এম সফিউল আজম চৌধুরী
| জন্ম | গিলাতলী কাজীবাড়ি, বিবির বাজার, কুমিল্লা |
| এসএসসি | কুমিল্লা জিলা স্কুল, ১৯৮৫ |
| এইচএসসি | নটর ডেম কলেজ, ঢাকা, ১৯৮৭ |
| এমবিবিএস | স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ১৯৯৫ |
| এফসিপিএস (প্রথম পর্ব) | জানুয়ারি ২০০০ |
| বিসিএস | ২০০০ |
| এফসিপিএস (সার্জারি) | জুলাই ২০০৬, চতুর্থ চেষ্টায় |
| কুমিল্লায় প্রথম পদ | আবাসিক সার্জন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২০০৭ |
| বর্তমান | অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারি বিভাগ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ |
| বিশেষজ্ঞতা | জেনারেল ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি |
Beside the big mosque near PG Hospital in Dhaka stood a pillar. In the late nineties, a cobbler sat at its base. A young doctor often came to him with a pair of leather sandals — their soles worn through, letting rainwater in. The cobbler would stitch them up, for two or five taka.
In July 1999, that young doctor passed the written part of his first FCPS exam. Next came the viva. But you cannot walk into a viva board wearing stitched-up sandals.
"I'd already sat the written exam — no one saw the water coming through my sandals," he said, laughing. "But what would I wear to the viva? I didn't have a shirt, I didn't have trousers."
An elder friend lent him fifteen hundred taka. At the time, his monthly salary from a clinic job was three thousand taka. From Elephant Road's Butter More he bought a pair of Oxford shoes for around five hundred fifty taka, then a white shirt from a discount shop nearby.
In the new shoes and white shirt, he sat the viva — and failed.
That young doctor is Prof. Dr. S. M. Sofiul Azam Chowdhury. Today he heads the Department of Surgery at Cumilla Medical College.
From his grandparents' home in Gilatoli
Beside the Bibir Bazar border in Cumilla lies the village of Gilatoli, his grandparents' home — where he was born and studied through second grade. Then came Ramkrishna Primary School and Niradasundari Primary School in Cumilla's Thakurpara, and then Cumilla Zilla School. He passed his SSC from Zilla School in 1985 and left for Notre Dame College in Dhaka for higher secondary.
Four decades on, he still rattles off his college roll number without pausing: "Eight-seven-two-nine-zero." Then he explains: "Eighty-seven batch, group two, roll ninety."
Back then his dream was to become an engineer. "My whole hope, my whole wish, was to be an engineer," he said. "I wasn't supposed to become a doctor."
But in ninth grade, a great grief entered his life — his mother died of cancer. "After my mother passed away, my father perhaps decided then that he'd make his son a doctor," he said.
After higher secondary, he won a seat at Sir Salimullah Medical College. In the same admission season his name appeared at position 137 on Dhaka University's merit list, and on BUET's waiting list. His father told him there was no need to pursue those. He joined medical college.
"Every day after Maghrib prayers, I'd study from seven to ten. All year round. I still keep to it."
In medical college he set himself one rule: three hours of study every evening, without missing a single day. He passed his MBBS in 1995.
"The thin boy who lives on the ward"
Coming to surgery traces back to a friend's single remark. His final exam's surgery section had gone very well. Walking out of the hall, his friend Abdullah Al Tareq told him, "You did so well in that exam — build your career in surgery."
During internship, he had his first hands-on experience with patients and operations on the surgery unit. He names two people with gratitude for this: Dr. Shahadat Hossain Sheikh, who later became a professor of colorectal surgery, and Professor A. B. M. Jamal, who later became Secretary of the BCPS.
He would enter the ward at eight in the morning, eat lunch, nap briefly, and return. He never worked at an outside clinic. He recalls that time with a smile: "Many used to say, this thin boy just stays on the ward all day."
One salary, two friends
When he was in his second year of medical college, his father retired. The family ran on a small pension, and he had two more brothers. Once his internship ended, he had to fund himself entirely.
In 1996 he took a medical officer's job at an old clinic in Moghbazar — one shift on duty, the other spent studying in the PG library. He lived in a mess on Nawab Habibullah Road behind PG Hospital, two or three men to a room. Later he took a continuous 24-hour duty at a clinic in Narayanganj, entering at ten at night and leaving at ten the next night. For a time he also saw patients an hour at midday, three days a week, at a garment factory. In three months he saved six thousand taka — that funded his BCPS course.
"At the end of the day, you have to eat," he said. "You need money, you need a place to stay, and only then comes study. Study was second, back then."
The warmest memory of that hard stretch is of friendship. A friend, Manjurul Rahim Jewel, worked at the same clinic. Shortly after he got into his MS, his savings ran out. The two friends then split the week's duties between them, one taking a shift, the other taking another — but the salary came in one man's name. "Whoever drew the salary, the two of us split it," he said. At exam time, one would cover the other's duty. That friend is now a professor of ENT.
Seventeen doors
It began with that viva in the white shirt and new shoes, and then door after door kept closing. In July 1999, FCPS Part 1; MS Part 1; the admission test at the National Institute of Traumatology and Orthopaedic Rehabilitation — he failed every one of them. He has kept his own count: across both parts of FCPS, three parts of MS and the admission test, he failed seventeen examinations in total.
"I was somewhat broken, mentally. But I held on to my resolve."
In January 2000, FCPS Part 1 again. The viva then ran ninety minutes, five boards back to back. "Whoever can hold their composure through those ninety minutes — they pass," he said.
After the exam, back at the hostel eating rice in the dining hall, someone came and told him he'd passed. "The boy who'd just passed FCPS Part One had two hundred taka in his pocket at the time," he said, laughing. Fifteen days remained before month's end. Dinner that night was egg-paratha from a shop below Pubali Bank near PG — two parathas and two eggs rolled together, eaten while walking.
A few days later, an acquaintance came by with a photocopied paper in hand. The lecturer post he had applied for and nearly forgotten about — he'd gotten it. He didn't quite believe it at first. That same year he also passed the BCS exam and joined government service.
The Thursday bus
After the BCS, his first posting was a health sub-centre in Burichong, Cumilla. Then Sylhet Medical College, followed by training at Chittagong Medical College from 2001 to 2003. He returned to Dhaka in 2004 for a postgraduate course. After failing three times in a row from January 2005, he passed FCPS Part 2 in July 2006, on his fourth attempt. He then became a registrar at Mitford Hospital in Old Dhaka.
His father died in November 2006. For nearly nine months after that, he traveled from Dhaka to Cumilla every Thursday, did the household's marketing, set everything in order, and caught the bus back to Dhaka on Friday evening — sometimes leaving at dawn on Saturday right after Fajr prayers, to report at Mitford that same morning.
"It was very hard," he said. "My body could barely keep up."
In 2007 he returned to his own city — Cumilla Medical College Hospital — as a resident surgeon.
The long road
The seventeen years that followed were the hardest chapter of his career. Chauddagram, Chandina, Cumilla Sadar, Sadar Dakshin, Chandpur — transfer after transfer. Sometimes he was posted to a role someone else was already filling. Sometimes he went months without a posting, without pay. At the college in Chandpur where he was sent as an associate professor, there wasn't even a room for him to sit in.
Speaking of that time, he returns again and again to two lines.
"I never sold out my principles. I never compromised when it came to a patient."
Coming home
In November 2024 he joined Cumilla Medical College. Beside him stood boyhood friends from Cumilla Zilla School and Salimullah Medical College, and a few old seniors. Today he is head of the Department of Surgery there, and sees patients in Cumilla as a general and laparoscopic surgeon.
Many years earlier, the first time he'd come to this college as a junior consultant, he had privately decided: "I'll come here, do some work, learn something, and teach the students." Now that wish had found its chance.
In the very city where his schooling began at a primary school, he now gives the next generation of surgeons their first lessons.
From a torn sandal to head of department. In between lay poverty, repeated failure and long uncertainty. He crossed that road with one thing — something he has named himself: jed. Resolve.
At a glance · Prof. Dr. S. M. Sofiul Azam Chowdhury
| Born | Gilatoli Kazibari, Bibir Bazar, Cumilla |
| SSC | Cumilla Zilla School, 1985 |
| HSC | Notre Dame College, Dhaka, 1987 |
| MBBS | Sir Salimullah Medical College, 1995 |
| FCPS (Part 1) | January 2000 |
| BCS | 2000 |
| FCPS (Surgery) | July 2006, on the fourth attempt |
| First post in Cumilla | Resident Surgeon, Cumilla Medical College Hospital, 2007 |
| Current | Professor & Head, Department of Surgery, Cumilla Medical College |
| Specialty | General & Laparoscopic Surgery |
ছবির অ্যালবাম
অপারেশন থিয়েটারে, সহকর্মীদের সাথে — কাজের দিনগুলোর কিছু মুহূর্ত। ছবিতে চাপ দিলে বড় করে দেখা যাবে।
তিনটা ধাপে সিরিয়াল
লিখে পাঠান — চেম্বার থেকে সময় জানিয়ে দেওয়া হবে।
প্রতিদিন বিকাল ৫টা – সন্ধ্যা ৭টা · শুক্রবার বন্ধ
শুক্রবার চেম্বার বন্ধ থাকে — দয়া করে অন্য দিন বেছে নিন।
হঠাৎ তীব্র পেট ব্যথা, একটানা বমি, পেট শক্ত হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে সিরিয়ালের অপেক্ষা করবেন না — সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
যা জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত লাগে
অপারেশন ছাড়া কি ভালো হবে না?
এটাই সবচেয়ে বেশি করা প্রশ্ন, আর এর উত্তর রোগভেদে আলাদা। কিছু সমস্যায় ওষুধ ও নিয়ম মেনে চলাই যথেষ্ট, কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনই একমাত্র পথ। পরীক্ষা করে না দেখে কোনোটাই বলা যায় না — তাই প্রশ্নটা চেম্বারে করাই ঠিক।
ল্যাপারোস্কোপিক আর সাধারণ অপারেশনের পার্থক্য কী?
সাধারণ অপারেশনে একটি বড় কাটা লাগে; ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে কয়েকটি ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও যন্ত্র ঢোকানো হয়। কোন রোগীর জন্য কোনটি প্রযোজ্য তা রোগের ধরন, আগের অপারেশন ও শারীরিক অবস্থা দেখে ডাক্তার ঠিক করেন।
কতদিনে স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারব?
এটি অপারেশনের ধরন, রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে — তাই আগে থেকে একটা নির্দিষ্ট দিন বলে দেওয়া ঠিক নয়। আপনার ক্ষেত্রে কী আশা করা যায়, ডাক্তার পরীক্ষা করে তা বুঝিয়ে বলবেন।
অজ্ঞান করা নিয়ে ভয় লাগে।
এই ভয়টা প্রায় সব রোগীরই থাকে, আর এটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা যায়। অপারেশনের আগে অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ আলাদা করে দেখে, আপনার শারীরিক অবস্থা ও আগের অসুখের ইতিহাস জেনে সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমবার চেম্বারে কী কী নিয়ে যাব?
আগের প্রেসক্রিপশন, আল্ট্রাসনো বা অন্য যেকোনো রিপোর্ট (থাকলে), বর্তমানে খাওয়া সব ওষুধের নাম, আর ডায়াবেটিস বা হার্টের সমস্যা থাকলে সেগুলোর কাগজপত্র।
আগে টেস্ট করিয়ে নিয়ে যাব, নাকি দেখানোর পরে?
যা আগে থেকেই করা আছে, সেগুলো সাথে নিয়ে যান। নতুন কোন টেস্ট দরকার তা দেখার পরেই ঠিক হয় — আগে থেকে অনুমান করে টেস্ট করালে অনেক সময় সেগুলো কাজে লাগে না।
ভিজিট কত?
সিরিয়াল নেওয়ার সময় হেল্পলাইন থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়।


ডাক্তারের পোস্ট
সেবার তালিকা আর চেম্বারের সময় — ছবিতে চাপ দিলে বড় করে পড়া যাবে।